বস

0

“বস”
– – – – – – – – – – – – – – – –
পীযূষ কান্তি দাস
– – – – – – – – – – – – – – – – – – – – –
টিফিনের টাইম । গেট থেকে বেরিয়েছে অনেকেই । কেউ কেউ অবশ্য ভেতরেই বসে বাড়ির থেকে আনা ডাল ভাত শাক চচ্চড়ি খাচ্ছে । অনন্ত একটুকরো ভেলি গুড় দিয়ে আর নকুল শীতের পাঁচমিশেলি সব্জি দিয়ে রুটি সাঁটাচ্ছে। হিন্দুস্তানী দারোয়ানটা ইয়াবড় ভুঁড়ি নিয়ে গেটের পাশে টুলের উপর বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে খৈনি ডলছে । একটা নেড়ি কুকুর গেটের বাইরে লেজ মুড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে । গেটের সামনে রাস্তা বিশ ফুটের মতো চওড়া ।সেই রাস্তার যেদিকে কারখানার গেট ঠিক তার বিপরীত দিকে একটা ময়লার ভ্যাট। কি নাই সেই ভ্যাটে? মাছের আঁশ , কলার খোসা , টকসে যাওয়া তরকারি ,ছেঁড়া জুতো , শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালা , মরা ইঁদুর, কাগজে মোড়া ইউজড কন্ডম মায় রক্তে ভেজা মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন, ইত্যাদি ইত্যাদি । গতবছর তো একটা আট ন মাসের বাচ্চার আধখাওয়া লাশও ভ্যাটের বাইরে পড়েছিল । তাই না দেখে খুব চেঁচামেচি ! কে যেন ফোন করে খবর দিল আর তার মিনিট পানেরর মধ্যেই থানা থেকে পেটমোটা বিশু দারোগা জিপে চেপে হাজির । এসেই তার সে কি হম্বিতম্বি ! কোথা থেকে এল এ সব ? কোন খানকি পেট খসিয়ে এখানে এসব ফেলে গেল ?
কারুর কাছে কোন উত্তর না পেয়ে শেষে সেই যে পাগলাটা যে পাশেই বাসস্ট্যান্ডের টিনের শেডের তলায় শুয়ে থাকে , কুকুরের সাথে লড়াই করে ভ্যাট থেকে খাবার খুঁজে খায় তাকেই চালান করে আর কি ! পথচলতি মানুষ যারা ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে গেছল , ভেবেছিল কোন তামাশা হচ্ছে তারাই প্রতিবাদ করে । শেষে কাউন্সিলরের চামচা কালু এসে বিশু দারোগাকে একদিকে ডেকে কানে কানে কি যেন বললে আর সাথে সাথে বিশু দারোগাও পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে থানায় ফোন করল । কিছুক্ষণ পরেই একটা মটর সাইকেলে চেপে থানার ধ্যাঙড়কে নিয়ে এক কনিষ্ঠগোপাল এল এবং একটা ছোট চটের বস্তায় সেই লাশ উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল।ভিড়ও অমনি পাতলা ॥
সুরভীর দেওয়া আলুপোস্ত আর বিউলির ডাল ভাত খেয়ে আমিও বেরিয়েছি । ইচ্ছা একটা বিড়ি খাই । বিবেকদার পানের দোকানের সামনে গিয়ে বলি বিবেকদা এক প্যাকেট লক্ষ্মী বিড়ি । ঠিক সেই সময় পিছন থেকে কে যেন বললে দাদা একটা তিনশ পান হবে। গলাটা কেমন চেনা চেনা মনে হল । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে শমীক। আমি বললাম কিরে শমীক কোথ্থেকে ?
দাঁত বের করে একগাল হেসে শমীক বললে আরে অনিকদা তুমি ? তা তুমি এখানে ? আমি বললাম আরে ওইতো আমাদের কারখানা বলে আঙুল তুলে দোকানের উল্টোদিকের সাইনবোর্ডটা দেখাই ।
সাইনবোর্ড বলতে গেটের উপর রঙচটে যাওয়া একটা লেখা “বিশ্বকর্মা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস”।
সাইনবোর্ডের হাল দেখলে যে কেউ সহজেই বুঝে নেবে তার বর্তমান হাল হকিকত ।
আমি বললাম তুইতো বললি না কোথ্থেকে ফিরছিস ?
সে পরে বলব’খন শমীক উত্তর দেয় ।
আমি প্যাকেট কেটে বিড়ি বের করি । একটা বিড়ি এগিয়ে দিয়ে বলি ঠিক আছে । সে পরে শুনব’খন ।নে বিড়িটা নে ।
শমীককে একটা বিড়ি দিয়ে আমিও একটা বিড়ি নিয়ে কানের কাছে নিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে মুখে নিই । পকেট থেকে দেশলাইটা বের করে ধরাতে গিয়ে দেখি একটাও কাঠি নাই । অগত্যা বিবেকদাকে বলি বিবেকদা , একটু ম্যাচিসটা হবে । পান সাজতে সাজতে বিবেকদা আঙুল দিয়ে দোকানের পাশে ঝোলানো লাইটারটা দেখিয়ে দিল । আমি বিড়ি ধরানোর পর শমীককে বিড়িটা এগিয়ে দিলাম । শমীক বিড়ির আগুনে বিড়ি ধরিয়ে আমায় ফেরৎ দিল । দুজনে দোকান থেকে একটু সরে গিয়ে আরাম করে সবে দুটো টান দিয়েছি এমন সময় একটা লাক্সারি কার এসে কারখানার গেটে থামল । এরকম গাড়ি বাপের জন্মে দেখিনি ! আমি শমীককে বললাম দ্যাখ দ্যাখ কি সুন্দর গাড়ি ! কত দাম হবে বলতো ?
শমীক কারটার দিকে তাকিয়ে বলল কি জানি ! তা বিশ -ত্রিশ লাখ হবে নিশ্চয় !
বলিস কিরে বিশ -ত্রিশ লাখ আমি অবাক হয়ে বললাম ! একটা গাড়ির অত দাম !
আমার কথা শুনে শমীক হি হি করে হাসল । দোক্তা পান আর বিড়ি খেয়ে খেয়ে তার দাঁতের যা রঙ তা আর কহতব্য নয় ॥
এমন সময় খট্ করে একটা আওয়াজ হল । ড্রাইভারের দিকের গেট খুলল । তারপর যা দেখলাম তাতে করে আমার আর শমীকের দুজনের চোখই আকাশে ওঠার জোগাড় । দেখলাম এক কুড়ি -বাইশ বছরের সুন্দরী, না না শুধু সুন্দরী নয় ছম্মক ছল্লু রকমের সুন্দরী পায়ে হাইহিল সু , হাঁটু অবধি পিংক কালারের স্কার্ট , চোখে রে ব্যানের সানগ্লাস গেটের সামনে গিয়ে সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল । তারপর গটগটিয়ে ফ্যক্টরির গেট দিয়ে ঢুকে সোজা মালিক অবনীবাবুর রুমের দিকে হাঁটা লাগাল । হিন্দুস্থানী দারোয়ান প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও তার বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে পিছনে পিছনে ছুটল । আর ঠিক যখন সে কাছে যাব যাব করছে ততক্ষণে রঙ্গিলার ঊর্মিলা অবনীবাবুর সামনে ॥
টিফিনের পর সব লেবার , সুপারভাইজার সহ সব কর্মচারীকে ডাকা হল অবনীবাবুর চেম্বারে । অবনীবাবু বললেন শুনুন আপনারা । ইনি হলেন মিস মুখার্জী। লণ্ডন থেকে এম .বি .এ করে এসেছেন । আজ থেকে এই ফ্যাক্টরির মালিক ।গত সপ্তাহে আমি এই ফ্যাক্টরি ওনাকে বেচে দিয়েছি । উনি কথা দিয়েছেন কোন কর্মচারীকে ছাটাই করবেন না । আশাকরি আপনারা সব্বাই ভালো থাকবেন॥
আমি বাবা বিশ্বকর্মাকে মনে মনে প্রণাম করে বললাম হে বাবা ! মালকিনের মতো আমাদের ফ্যাক্টরির চেহারাটাও বদলে দাও। আর কৃপা করে দেখো মাসের শেষে বেতনটা যেন ঠিক মতো পাই॥

Read more

0
error: Content is protected !!