কোভিড 19 – আশীর্বাদ না অভিশাপ

20+

হ্যাঁ রে চিনু সন্ধ্যেবেলা গালে হাত দিয়ে কি এত ভাবছিস? এই সময়টা তার নাম গুণগান করলেও তো পারিস? এক নিঃশ্বাসে বলে তবে থামেন সবিতা দেবী — উনি চিনুর মা। সবিতা দেবী এখনো বছর তিরিশের ছেলেকে সব বিষয়ে বলে বলে করান। তার মতে ছেলে বয়সেই বেড়েছে। চিনুর ভালো নাম চিন্ময় বসাক। বাড়িতে সবাই তাকে চিনু বলেই ডাকে। না গালে হাত দিয়ে ভাবার মতো ছেলে খুব একটা নয় সে। আর পাঁচটা দিনের মতো হলে চিনু এখন অফিসে। চিনু আইটি সেক্টরে বড় পোস্টে কাজ করে। কিন্তু এখন সময়টা তো আর স্বাভাবিক নেই। দেশজুড়ে লকডাউন চলছে, অদৃশ্য মারণ রোগ কোভিড নাইনটিন এর হাত থেকে বাঁচতে। সেজন্য অফিস কাছারি সব বন্ধ। শুধুমাত্র এসেনশিয়াল সার্ভিস ছাড়া। এই লক ডাউনে আর একটা জিনিস হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত প্রথম থেকে আবার টিভিতে দিচ্ছে। ইঁদুর দৌড়ের চক্করে ছোটবেলার না দেখার আফসোস আজ মিটে যাচ্ছে চীনুর মতো আরো অনেকের। সেই মহাভারতের একটা এপিসোড চিনুকে বড় ভাবিয়ে তুলেছে। সেই নিয়েই চিনু একটু চিন্তিত ছিল। এমন সময় ঘরে মায়ের প্রবেশ, হাতে সন্ধ্যাদীপ নিয়ে। এ বিষয়ে সবিতা দেবি বড়ই বিশ্বাসী। রোজ দুবেলা ঠাকুর সেবা তাঁর প্রাত্যহিক কর্মের অন্যতম অঙ্গ। এখন এর সঙ্গে দুটি জিনিস যুক্ত হয়েছে বর্তমান কঠিন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে। তাহলো নিয়ম করে সন্ধ্যেবেলা কর্পূর জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া ঘরে ঘরে দেওয়া। এতে নাকি ঘরদোর দূষণমুক্ত হবে, ভাইরাস কীটপতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা পাবে। আর দ্বিতীয়টি হল মোক্ষম। প্রতিদিন ডেটল জল দিয়ে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করা। যার দায়িত্ব চিনু ও তার বাবার উপর পড়েছে। এখন বাড়িতে কাজের দিদিও আসতে পারছেনা। মায়ের করা বারণ। এসবই সবিতা দেবির মর্ডান হওয়ার ফল। গুগলের সাথে পরিচয় হয়ে চিনুর মা বড়ই জ্ঞানলব্ধ হয়ে উঠেছেন। যদিও এই সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে পরিচয়টা তাকে চিনু করে দিয়েছিল। এখন নিজেই নিজের হাত কামড়াচ্ছে। তাই সে চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অফিসটা যেন খুলে যায়। তবে এসব ঝামেলা ঘাড় থেকে নামানো যাবে। বাবা আশুতোষ বসাক, রিটায়ার্ড রেলকর্মী। তিনি নামে নয় কাজেও আশুতোষ। স্বল্পেই সন্তুষ্ট। আর তার মতে গিন্নির উপরে কথা বলা তো উচিতই নয়। না মজা নয়। কার্যসূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাকে ঘুরতে হয়েছে অর্ধেক জীবন। তখন সবিতা দেবী পুরো সংসারের ঝক্কি সামলেছেন একা। যাক আসল কথা ছেড়ে অনেক দূরে চলে এলাম। জেনে নেওয়া যাক চিনুর চিন্তার আসল কারণটা কি?

চিনুর মা-কে বলল – “জানো মা আজ মহাভারত দেখতে বসে মনে বেশ কিছু প্রশ্ন এলো বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে। চিনুর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনার অনেকখানি সবিতা দেবি সামলেছেন। কলেজ থেকে যদিও নিজের পড়াশোনাটা নিজেই সামলেছে সে। কিন্তু জীবনে যে কোন সমস্যায় পড়লে তার উত্তর সে মায়ের থেকেই খুঁজতো। চিনু বলে চলে – “মহাভারতের পঞ্চপান্ডব এর সর্বনেশে পাশা নেশার কারণে স্ত্রী দ্রৌপদীর অপমান হল, ১২ বছর বনবাস আর এক বছর অজ্ঞাতবাস হলো। শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন অজ্ঞাতবাস পরবর্তী যুদ্ধ প্রস্তুতিতে দিব্যাস্ত্র আহরনে দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে ধ্যানে বসেন। সেই দীর্ঘ উপাসনার একটি অংশ আজ মহাভারতের পর্বে দেখে খুবই বিস্মিত হলাম। মা তুমি তো জানো যে সেই উপাসনায় দেবরাজ ইন্দ্রকেও সন্তুষ্ট করেন এবং তার আশিস নিতে নন্দনকাননে যান স্বয়ং অর্জুন। সেখানে অপ্সরা উর্বশী বিমুগ্ধ হয়ে অর্জুনকে পানিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু অর্জুন তা ফিরিয়ে দেওয়ায় উর্বশী তাঁকে এক বছরের জন্য নপুংসক শরীর ধারণে বাধ্য হওয়ার অভিশাপ দেয়। কিন্তু সত্যের দিকে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আছেন। সুতরাং পরে তিনি অর্জুনকে বোঝান যে অজ্ঞাতবাসকালে এই অভিশাপই তার কাছে আশীর্বাদ রূপে ফিরে আসবে।

এতক্ষণ চুপ থেকে সবিতা দেবি বললেন সে তো জানি কিন্তু এর সাথে বর্তমানের কোভিড নাইনটিন-এর কি সম্পর্ক সেটাই বুঝতে পারছি না? তুই এর থেকে কি বুঝাতে চাইছিস?
চিনু বলে দেখো মা আজ বিশ্বজুড়ে গভীর সংকট নেমে এসেছে। একটা রোগ মানবজাতিকে কত কি শেখাচ্ছে বলতো? প্রকৃতির উপর মানুষের প্রতিনিয়ত অন্যায় অত্যাচার আজ এই রোগের জন্য কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত। কলকারখানা, গাড়ি চলাচল বন্ধ বলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা, কয়েক দশকের থেকে অনেকখানি কমে গেছে। পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছপালা প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজ তারাও প্রাণখুলে বাঁচছে। তার অনেক প্রমাণ টিভিতে, খবরের কাগজে তো রোজই দেখছি। খাঁচাবন্দি পশুরা কেমন থাকে তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে মানুষ গৃহবন্দী হয়ে। মানুষ আরও বুঝেছে, শিখেছে। যেমন– হাইজিন বিষয়ে সতর্ক হয়েছে, পরিষ্কার কিভাবে থাকতে হয়, বিপদে কিভাবে একজোট হয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে হয়, পুষ্টিকর খাবার বিষয়ে সর্তক হয়েছে, ইমিউনিটি পাওয়ার বিষয়ে বুঝতে শিখেছে, সামাজিক দূরত্ব স্থাপনে পাশ্চাত্য রীতি যে ভ্রান্ত তাও বর্তমান প্রগতিশীল নব্য সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো করোনা ভাইরাস। এই আপাত ভয়ঙ্কর দেখতে মারণ রোগটা আমাদের এত কিছু জীবনের ইতিবাচক দিক শেখালো, ভ্রান্ত পথযাত্রী মানবজাতিকে প্রকৃত উন্নয়নের পন্থায় ফেরালো। আর আমরা কি পারিনা, এই কঠিন সময়ে নেমে আসা কোভিড নাইনটিন নামক অভিশাপকে আশীর্বাদে পূরণ করতে একজোট হয়ে কিছু সুস্থ পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাধিকে হারাতে? এই কঠিন পরীক্ষায় শেখা সকল শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ জীবনের পাথেয় করে নব প্রজন্মের কাছে আরো সুস্থ নির্মল পৃথিবী দেওয়ার অঙ্গীকার এই মুহূর্ত থেকে শুরু হোক। বিজ্ঞান মতে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতশীল জীব, অসীম সত্তার অধিকারী মানুষের কাছে তা অসাধ্য নয় কিন্তু দুঃসাধ্য বটে।
চিনুর ভাবনার কথা শুনে সবিতা দেবি মুখে কিছু বললেন না। শুধু ছলছল চোখে ছেলের মাথায় হাত রেখে ভাবলেন তার ছেলে মানুষ করা বৃথা হয়নি।

20+

Leave a Comment

error: Content is protected !!