বোধন (পঞ্চম থেকে অষ্টম পর্ব)

0

পূর্ববর্তী চার পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

।। পাঁচ ।।

নাহ! আজ আর কিছুতেই ঘুম আসছে না। আর ঘুম না এলেই এলোমেলো চিন্তারা এসে মাথায় ভিড় করে। বিছানা থেকে উঠে জল খেয়ে এসে আবার শুলো চন্দন, কিন্তু ঘুম নেই। মিলন দার বলা কথা গুলো মাঝে মাঝেই মনে পড়ছে। শুয়ে শুয়েই চন্দন ভাবছে তাহলে কি তার আর মণির বন্ধুত্বকে সমাজ খারাপ ভাবে নিচ্ছে? কিছুই বুঝতে পারছে না চন্দন। যদি মণিকেও কেউ এমন কথা বলে, যেমনটা আজ মিলন্ দা তাকে বললো, তাহলে তো মণি হয়তো লজ্জায়ে আর কথাই বলবে না তার সাথে। খুব বাজে হবে তাহলে ব্যাপারটা। এবারে চন্দন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা, মণি তো এতো ছোটো আমার থেকে, তাও তো ওকে বোন ভাবিনা। তাহলে কি আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কে ভালোবাসা মিশে আছে? কিন্তু, আমি তো মণিকে প্রেমিকাও ভাবিনা। আবার একটা হালকা টান ও অনুভব করি ওর প্রতি। তাহলে মণি কে আমার জীবনে? শুধুই কি বন্ধু নাকি…….?”

আর যেন চন্দন ভাবতে পারছে না। কেমন যেন ঘেঁটে গেলো। খুব বিরক্ত লাগছে ওর এবার। ঘুমকে নিজের চোখে আনার জন্যে চন্দন চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসে শুয়ে পড়লো বিছানায়।

।। ছয় ।।

“কি গো রং কতদূর চলছে তোমার? আমি কিন্তু মায়ের অলংকার প্রায় বানিয়ে ফেলেছি”। হাসি হাসি মুখে মণি তার চন্দন দাকে জিজ্ঞাসা করলো।

-“হ্যাঁ রে, এই চলছে। আশা করছি রং করা এবং রং শুকানো কিছুদিন পরেই হয়ে যাবে। তারপর আমার বানানো প্রতিমা তোর বানানো অলংকারেই সেজে উঠবে”।

-“আর তারপরেই পুজো” আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠলো মণি। চন্দন হাসিখুশি মণির দিকে তাকিয়ে ভাবলো মণির হাসি দেখতে যেন তার ও ভালো লাগে। মণির হাসি ভরা মুখ কোথাও যেন সুখ দেয় চন্দন কে। 

।। সাত ।।

“বাহ! চন্দন খুব সুন্দর হয়েছে প্রতিমা। তোর বানানো প্রতিমা দেখলে মনে হয় যেন তারা জীবন্ত। এই কুমোরটুলি তে একমাত্র তোর কাজেই এটা দেখতে পাই”। কাঞ্চন কাকা প্রতিমা গুলো দেখতে দেখতে বললো।

-“এসো এসো কাকা। কতদিন পর এলে দোকানে”। কাঞ্চন কাকাকে দেখে চন্দন খুব আপ্লুত হয়ে উঠলো।

-“রং পুরো শুকিয়ে গেলে আমাদের দোকানের অলংকার দিয়ে সাজিয়ে নিস। তা তোর প্রতিমা গুলো যাবে কবে?”

-“এইতো চার থেকে পাঁচদিন পর ধরে রাখো । এবার আরেকটু শুকালেই অলংকার দিয়ে সাজিয়ে নেবো । ব্যাস! তাহলেই তৈরি”।

।। আট ।।

“হ্যালো, দাদা কেমন আছিস?” বাবলুর ফোনে চন্দনের ঘুম ভাঙলো।

-“হ্যাঁ ভাই ভালো আছি। তুই কেমন আছিস ওখানে? তোর কাজ কেমন চলছে ?”

-“ হ্যাঁ রে, ভালো আছি। তোর জন্য একটা Surprise আছে”।

-“কি রে? কলকাতায় আসবি?”-“আরে! না! তুই আসবি আমার কাছে আমেরিকার টেক্সাসে”।

বাবলুর কথায় চন্দন খুব চমকে গেলো। ভাইটা বলে কি?

-“মানে ? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না”।

-“শোন, এখানে একজন মৃৎশিল্পী আছেন মানে আমারই বন্ধু। বিভিন্ন Design এর মূর্তি বানায়। তো আমি আমার বন্ধুকে তোর কাজের ছবিগুলো দেখাই। ওর দারুণ লাগে। তোকে Assistant করতে চায় । এখন তোকে ছোটো করে বললাম। বাকিটা নিজে এলেই বুঝবি। আমরা দুই ভাই একসাথে কাজ করবো”।

চন্দন যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। এতো চন্দনের কাছে হাতে চাঁদ পাবার মতো অবস্থ ।

-“বলিস কি ভাই! আমি আমেরিকায় যাবো? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না! এই ভাই, তুই মজা করছিস না তো?”

বাবলু এবার হেসে উঠলো। হাসি থামিয়ে বলল, “না রে, দাদা একদম সত্যি বলছি। এটা কোনো ইয়ার্কি না। আর শোন আমি সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছি। ৯ই October তোর ফ্লাইট। আমি মানিককে বলে দেবো ফোন করে, ও তোকে অনলাইনে টিকিট বুক করে দেবে। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুই কিচ্ছু চিন্তা করিস না”।

-“ঠিক আছে, সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এতো খরচ আমি কোথা থেকে পাবো? আমার কাছে তো অতো টাকা নেই”।

-“তুই কিরে দাদা, আমি থাকতেও তুই টাকার কথা ভাবছিস ? তুই এতদিন আমায় বড়ো করতে কত টাকা খরচ করেছিস বলতো! আমার তো বাবা-মা কে সেভাবে মনেও নেই। তুই তো আমায় কোলেপিঠে করে বড়ো করলি। তুই তো আমার সব। আমার কি তোর জন্যে এইটুকু করার অধিকার নেই?”

ভাইয়ের কথা শুনে চন্দন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লো।

-“হ্যাঁ রে, ভাই এইটুকু অধিকার আমি তোর থেকে কেড়ে নেবো না। ঠিক আছে আমি কোন চিন্তা করবো না। খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে আমাদের”।

-“ ঠিক আছে, তুই এখন রেস্ট নে। পরে আবার ফোন করবো। এখন রাখি, কেমন। Good Night”।

ফোন রাখার পর চন্দনের চোখে আনন্দে আর ঘুমই আসছে না। এতদিন ও কে সবাই বলেছে ভাইয়ের কাছে যেতে। এখন ভাই নিজেই ডেকে নিলো। চন্দন বিছানা থেকে উঠে ক্যালেন্ডার টা দেখলো ৯ই October মানে ঐ দিন দশমী। আর আজ ৩০সে সেপ্টেম্বর এ পড়লো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো, ১২ টা বেজে গেছে। তার মানে দশমীর দিনেই সে বিদেশে পাড়ি দেবে। অন্য একটা জগৎ। হঠাৎ করে জীবনটা এমন পাল্টে যাবে চন্দন ভাবতেই পারছে না। মহালয়ার দিনেই একটা চমকপ্রদ খবর এলো চন্দনের জীবনে। কিন্তু এখানাকার সবাইকে ছেড়ে চন্দনকে যেতে হবে, এটা ভেবেই মনটা একটু আনমনা হয়ে গেলো।  ছোট্ট বন্ধু মণির সাথেও আর দেখা হবে না তার। সবার জন্যে খারাপ লাগলেও সবাই যখন শুনবে তার বিদেশযাত্রার কথা সবাই খুব খুশি হবে। মণি তো খুবই খুশি হবে। তাই চন্দন ঠিক করলো তার এই সুখবর প্রথম সে তার বন্ধু মণিকেই জানাবে। নাহ! আজ আর ঘুম হবে না। ভোর  ৪ টে বাজতে আর বেশি বাকি নেই। আর ৪ টে বাজলেই মহালয়া। সুতরাং কিছু সময় জেগে কাটিয়ে ভোরবেলায় মহালয়া শুনেই ঘুমাবে সে।

রচনা – দেবশ্রী

পরবর্তী চার পর্ব আগামি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে।

পূর্ববর্তী চার পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

0

Leave a Comment

error: Content is protected !!