বোধন (অন্তিম চার পর্ব)

1+

এই গল্পের আগের পর্ব গুলো পড়ার জন্য নীচের Link গুলোতে ক্লিক করুন

প্রথম চার পর্ব

মাঝের চার পর্ব

।। নয় ।।

“কিগো, চন্দন দা আজ দোকানে আসতে এতো দেরি হলো যে? একটু পরেই তো প্রতিমা নিতে লোকজন আসবে”। মণি চন্দনকে দোকানে গিয়ে এই কথা জিজ্ঞেস করলো।

-“কথা আছে মণি। দারুন খবর দেবো তোকে। আগে একটু দোকানটা গুছিয়ে নিই। সবে তো খুললাম, একটু পরে বলছি”।

মণি চন্দন দার হাবভাব দেখে খুব বিস্মিত হলো। মণি চন্দনদাকে না ঘাটিয়ে নিজের দোকানে চলে গেলো। মণি তো ভেবেই পাচ্ছে না চন্দন দা তাকে কি কথা বলতে পারে। খুব অস্থির লাগছে মণির। এখন তো লোকজন এসেছে চন্দন দার কাছে তাদের বায়না করা প্রতিমা নিতে। পুজো তো এসেই গেলো, বাড়ির ঠাকুর তো প্রথমা থেকেই মোটামুটি যাওয়া শুরু করে। তাই লোকজনের ভিড় ও বেশ হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চন্দন দা এলো মণির কাছে। চন্দন মণির কাছে আসতেই মণি জিজ্ঞেস করে উঠলো, “কি খবর গো চন্দন দা? তাড়াতাড়ি বলো, আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

-“আগে বল, খবরটা শোনার পর কি খাবি? যা খেতে চাইবি খাওয়াবো” ।

-“আগে বলোতো কি খবর? তারপর খাওয়ার কথা বলবো”।

-“খবরটা প্রথম তোকেই বলছি। এখন কিন্তু কাউকে বলবি না”।

-“ঠিক আছে, তাই হবে। কাউকে বলবো না, তুমি এখন বলতো”।

-“আমি ভাইয়ের কাছে আমেরিকায় যাচ্ছি”।

-“ঘুরতে?”

-“না রে, কাজে। ভাই একজনের কাছে আমার কাজের কথা বলে রেখেছে। সেই কাজেই যাচ্ছি। আমার ভাইয়েরই চেনা জানা লোকটি। সে আমার কাজের ছবি দেখেছে, তার খুব ভালো লেগেছে। সব ঠিকঠাক কাজ চললে ওখানেই থেকে যাবো”।

চন্দন দার এই খুশির খবর শুনে মণির বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। চারপাশটা এক নিমেষেই যেন শূন্য হয়ে গেলো। পুজোর শুরুতেই একি শুনলো মণি! তার চন্দন দা চলে যাচ্ছে! আর সে দেখতে পাবে না? চন্দন দার উন্নতিতে মণি খুশি হলেও তার প্রিয় মানুষটিকে আর দেখতে না পাবার দুঃখ হচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজের দুঃখ লুকিয়ে হাসি মুখে মণি বলল, “বাহ! এতো দারুন খবর! কবে যাচ্ছো?”

-“৯ই অক্টোবর মানে দশমীর দিন”।

আবার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। চন্দন দাকে দেখার দিন তো ঘনিয়ে আসছে তার। মণি আপ্রাণ চেষ্টায়ে কোনমতে চোখের জল আটকালো।

-“কি রে! চুপ কেন?”

চন্দন দার প্রশ্নে মণির ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো। ভাবনা কাটিয়ে মণি চন্দন দাকে বললো, “আজ আমি উঠি গো, একটা জরুরি কাজ মনে পড়ে গেছে”।

-“ঠিক আছে চল, আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি বরং”।

চন্দন দার দিকে না তাকিয়েই মণি মৃদু হেসে বললো, “তুমিই তো এগোচ্ছ আমাদের ছেড়ে। আমি আর নতুন করে কোথায় এগোবো। আমি একাই যেতে পারবো”। মণির কথা কেমন যেন হেঁয়ালি লাগলো চন্দনের কাছে। চন্দনের মাথায় মণির হেঁয়ালি খোঁচা দিলেও, মনে সেই খোঁচা আসতে দেয়নি চন্দন। চন্দন বুঝেও যেন বুঝতে পারলো না। আর মণির মন ভাবে চন্দন দা বুঝেও বুঝতে বুঝতে চাইছে না তার কথা।

।। দশ ।।

– কিরে, এখানে চুপচাপ বসে আছিস? কাল তো তোকে প্যান্ডেল ও দেখলাম না”। রীতা দির কথায় জানলার বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে ফিরে তাকালো মণি।

-“আরে এসো এসো, বসো। অনেকদিন পর এলে”।

-“আমি না হয় অনেকদিন পর এলাম। কিন্তু তুই কাল প্যান্ডেলে আসিস নি কেন?”

-“না, মানে আমি কাল ছিলাম না”।

-“কেন মিথ্যে বলছিস আমায়? আমি তোর কাছে আসার আগে কাকিমার সাথে কথা বলে এসেছি, উনি বললেন কাল তুই বাড়িতে থেকেও কোথাও বার হসনি”।

মণির কাছে আর কোনো মিথ্যা উত্তর নেই রীতা দিকে বলার জন্য। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর রীতা মণির কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কি হয়েছে তোর, যে তুই আমাকেও মিথ্যে কথা বলছিস! আমায় বল। আমি শুনব তোর কথা”।

রীতার কথা শুনে মণির চোখ ছলছল করে উঠলো।

-“কিরে বল। চন্দনকে নিয়ে কিছু?”

এবার আর মণি চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। তার রীতাদিকে জড়িয়েই হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে মণি বললো, “চন্দন দা চলে যাচ্ছে গো আমেরিকায়। আর আসবে না। ওখানেই থাকবে”।

-“তা তোর চন্দন দার তোর প্রতি কি অনুভূতি? সে কি জানে তোর মনের কথা?”

-“না গো জানে না। আমি কখনোই কিছু বলিনি। বললে হয়তো চন্দন দা খুব খারাপ ভাববে। আর আমার সাথে কথাই বলবে না হয়তো। আর আমার মনে হয় চন্দন দার আমার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই”।

-“কি করে বুঝলি যে চন্দনের কোনো অনুভূতি নেই তোর প্রতি? তুই যে এতো ছোট, তা তোকে বোন ও তো বলে না। তাহলে কিছু তো ভালো লাগা থাকতেই পারে তোর প্রতি। চন্দন ও হয়তো এটাই ভাবছে যে তুই জানতে পারলে হয়তো তুই ও কে খারাপ ভাববি, যেমনটা তুই ভাবছিস”।

-“না গো, রীতাদি আমার তা মনে হয় না। চন্দন দা আমায় শুধু বন্ধু ভাবে। এছাড়া আর কিছু না”।

-“তা তুই এতোটা নিশ্চিত হচ্ছিস কি করে! হতেও তো পারে ওর তোর প্রতি অনুভূতি আছে। আর নয়তো বা চন্দন নিজের অনুভূতির কথা নিজেই বুঝতে পারছে না। সেক্ষেত্রে তোকে তো এগোতে হবে। চুপ করে থাকলে এই দুনিয়াতে কিচ্ছু হবে না। ও তো এমনিই চলে যাচ্ছে। তা তুই যদি নিজের অনুভুতির কথা ও কে জানান দিস, তাহলে ও তোকে নিয়ে কিছু ভাবতেই পারে”।

রীতার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কি যেন একটা ভেবে মণি উত্তর দিলো, “না গো দিদি, আমি চন্দন দাকে অনেকদিন ধরেই চিনি। ওর যদি কিছু মনে থাকতো তাহলে ও আমায় জানাতো। ওর জীবনে আমার প্রেমিকা হবার বা আমার স্ত্রী হবার কোনো জায়গা নেই”।

-“দেখ মণি, আমি তোকে অনেকদিন ধরে চিনি। তুই কষ্টে থাক এটা আমি চাই না। যাতে তুই ভালো থাকতে পারিস তার জন্যই তোকে একটা চেষ্টা করতে বললাম। এতে তো ভালো হতেও পারে। এবার বাকিটা তুই ঠিক কর কি করবি”।

-“আমি চন্দন দা কে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। কিন্তু সে তো চায়না তা। আমি চেষ্টা করে বিফল হবো গো। যেটুকুও বন্ধুত্ব ছিল, বলার পর হয়তো সেটুকুও আর থাকবে না। আমি চাই চন্দন দা যাবার সমায় আমার সাথে কাটানো ভালো স্মৃতি গুলোই নিয়ে যাক”।

-“ঠিক আছে রে। আমার আর কিছু বলার নেই। যেটা ভালো মনে করিস কর। পারলে একটু ফ্রেশ হয়ে প্যান্ডেলে আয়, সবার সাথে কথা বললে মনটাও ভালো লাগবে”।

ঠোঁটের কোনে আলতো হাসির ঝিলিক রেখে মণি বলল, “যাচ্ছি”।

।। এগারো ।।

-“আজ দেখা করবি মণি? আজ তো নবমী। কাল তো দশমী। আর আমি তো…” চন্দন দার কথা থামিয়েই মণি বললো, “হ্যাঁ জানি, কাল তো বোধন”।

-“মানে?”

-“মানে কাল থেকে তোমার নতুন জীবনের বোধন হবে”।

-“হ্যাঁ তা ঠিক। তা তুই কি আসবি একবার আজ?”

-“কোথায়?”

-“বাগবাজারেই আয়”।

ঠিক আছে বলে মণি ফোন টা রেখে দিলো। মণিকে আজ ভালো অভিনেত্রী হতেই হবে যেভাবেই হোক। মণি সত্যিই চন্দন দার উন্নতি চেয়েছিলো কিন্তু সেই উন্নতি তাকে বাদ দিয়ে সেটা মণি চায়নি। মণির ধারণা ছিলো চন্দন দা তার নিজের কাছের মানুষের মন বোঝে, কিন্তু মণি যে ভুল জানতো সেটা এখন প্রমানিত হলো ।

।। বারো ।।

“খুব সুন্দর লাগছে তোকে”। মণিকে দেখেই চন্দন বললো। কিন্তু মণি চন্দন দার কথা একপ্রকার পাত্তা না দিয়েই বললো, “চলো বাগবাজার সার্বজনীনের ঠাকুর দেখে আসি”।

দুজন মিলে প্রতিমা দর্শন করে মায়ের ঘাটে গিয়ে বসলো ।

-“তোদের সবাই কে খুব মনে পড়বে রে আমার”।

-“হুম । তুমি সব ঠিক মতো গুছিয়ে নিয়েছো তো?”

-“হ্যাঁ রে। গোছানো হয়ে গেছে। আর ভাই ওর বন্ধু মানিককে বলে সব কিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমায় কোনো সমস্যাতেই পড়তে হলো না”।

-“হুম। কটায় যাচ্ছ কাল?”

-“সকাল ৯ টায় বেরবো”।

-“বাহ! খুব ভালো। মন দিয়ে কাজ করো। ভালোভাবে থেকো। শরীরের যত্ন নিও”।

-“হ্যাঁ রে। তুই ও কাঞ্চন কাকার কাছে মন দিয়ে কাজ করিস”।

-“হ্যাঁ মন দিয়ে কাজ করবো। কিন্তু কাঞ্চন কাকার কাছে না। অন্য জায়গায়। আমার বাড়ির কাছাকাছি”।

চন্দন শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গেলো।

-“সে কি কেন? কিছু বলেছেন উনি?”

-“না তো”।

-“তাহলে ছাড়লি কেন?”

-“আসলে মায়ের শরীর তো ভালো যায় না। তাই কাছাকাছি কাজ করলে সুবিধা। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে পারবো”।

-“ওহ”। একটু থেমে চন্দন বললো।

-“এখানে তুই আমার ভালো বন্ধু ছিলিস। তোকে খুব মনে পড়বে আমার। ফোন করবো তোকে”।

মণি চুপচাপ গঙ্গার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই নিজে ভাবলো, তোমার শুধু আমায় বন্ধুই মনে হলো! আর কি কিচ্ছু চোখে পড়লো না? সবার কষ্টই বুঝতে পারো কিন্তু তোমার মণির মনই বুঝলে না! কাঞ্চন কাকার দোকানে গেলেই যে উল্টোদিকে তাকালেই তোমায় বেশি করে মনে পড়বে। এটাও বুঝলে না তুমি?

-“কিরে চুপ কেন ?”

সম্বিত ফিরে মণি উত্তর দিলো, “না গো, বাড়ি যেতে হবে। মা বাড়িতে অনেকক্ষণ একা”। মণি এবার উঠলো বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে বলে।

-“আজ না করিস না মণি। আজ তোকে স্টেশন অবধি ছাড়তে যাই । প্লিজ”।

-“ঠিক আছে চলো”।

দুজনেই আর কোন কথা বলল না। চন্দনের ও মন টা খারাপ লাগছে। শুধু যে নিজের জন্মস্তান ছেড়ে যাচ্ছে তা নয়। তার কাছের লোকেদের জন্যও মন খারাপ লাগছে। আর আজ মণির সাথে দেখা হবার পর মণির জন্যও মন খারাপ লাগছে। আর দেখা হবে না হয়তো মণির সাথে, আর হলেও সে অনেকদিন পরে। এইসব ভাবতে ভাবতে চন্দন একবার মণির দিকে তাকালো, মেয়েটি যেন আজ বড়ো নীরব। বোধহয় ওর ও খুব মন খারাপ ,তাই আর হয়তো বিশেষ কথা বলছে না।

আর মাত্র কিছু সময় একসাথে। তারপরেই আর হয়তো দেখা হবে না। এসব ভাবলেই যেন মণির অভিনেত্রী সত্ত্বা ভেঙে প্রকৃত মণি বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু প্রাণপণে তার অভিনয়কে বাঁচিয়ে রেখে চলেছে। মণি আর চন্দন দুজনেই বাসে করে শিয়ালদহে এলো। শিয়ালদহ স্টেশনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর বড়ো স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ৫ টা ৫৮ র হাসনাবাদ লোকাল। মণিকে যেতে হবে বারাসাত।

-“তুমি কি যাবে প্ল্যাটফর্ম অবধি ?”

-“ হ্যাঁ, যাবো তো। চল”।

সারাজীবন যখন চলতে চাইলো না একসাথে, তখন আর এইটুকু একসাথে গিয়ে কি হবে! কিন্তু মণি মনে ভাবলেও এই কথা মুখে বলতে পারলো না কিছু।

ট্রেন এসে গেলো ৯ নং প্ল্যাটফর্মে। লোকজন নামার পর ট্রেনের মহিলা কামরায় উঠে দরজার সামনে দাঁড়ালো মণি। আর চন্দন দরজার বাইরে প্ল্যাটফর্মে।

-“মণি, তোর জন্যে একটা জিনিস এনেছি”।

-“কি?”

একটা কাগজে মোড়া জিনিস ব্যাগ থেকে বার করে চন্দন মণিকে দিলো।

-“কি আছে এতে?”

-“আছে কিছু একটা জিনিস। যা আমার বানানো। কিন্তু এখন খুলিস না। বাড়ি গিয়ে দেখিস”।

-“ঠিক আছে”।

দুজনেই দুজনকে নীরব দৃষ্টিতে দেখলো খানিকক্ষণ।

-“কাল আসবি এয়ারপোর্টে আমায় ছাড়তে?”

-“না গো, তোমায় আমি ছাড়তে পারবো না”। এটা বলতে গিয়ে এবার মণির গলাটা সত্যিই একটু কেঁপে গেলো। কিন্তু চোখের জল এখনো মণির নিয়ন্ত্রনেই আছেই। এবার ট্রেন ছাড়ার জন্যে সাইরেন বাজলো। ট্রেন ছাড়া মাত্রই একে অপরকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এগোতে শুরু করলো আর সাথে মণির চোখের জলও তার নরম দুটো গাল স্পর্শ করলো। কিন্তু চন্দন দা দেখতে পেলো না। আর কখনোই পাবে না। মণি চোখের জল মুছে চন্দন দার দেওয়া জিনিসটা কাগজ খুলে বার করলো। দেখলো একটা ছোট্ট দুর্গা মূর্তি। তার গায়ে লাগানো একটা চিরকুটও আছে। তাতে লেখা আছে – “প্রতিটি নারীর মধ্যেই মা দুর্গাকে পাওয়া যায়। আমার চোখে তুইও এক ছোট্ট দুর্গা। দশমীর দিন আমার নতুন জীবনের বোধন হলেও, তা অতীতকে বিসর্জন দিয়ে নয়। তুই ভালো থাকিস। তোর কথা মনে পড়বে আমার”। চিরকুট পড়া শেষ হলেও, চোখ থেকে জল পড়া শেষ হয়নি।

রচনা – দেবশ্রী

এই গল্পের আগের পর্ব গুলো পড়ার জন্য নীচের Link গুলোতে ক্লিক করুন

প্রথম চার পর্ব

মাঝের চার পর্ব

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

1+

Leave a Comment

error: Content is protected !!