বোধন

1+

।। এক।।

“বাহ! চন্দন, কাজ তো মনে হচ্ছে দারুণ এগোচ্ছে”। পিছন ঘুরে চন্দন দেখে মিলনদা সকাল সকাল হাজির।

-“কই আর এগোচ্ছে, সবে তো কাঠামো করা হল। পুরো রূপ দিতে এখনো অনেক দেরি। তবে যাই বলো পুজোর আগে তো করতেই হবে”।

-“হ্যাঁ, তা তো করতেই হবে”। হাসি হাসি মুখে মিলনদা বলল।

-“তা কি ব্যাপার এতো সকালে এখানে? দোকান খুলবে না?” হাতের কাজ শেষ করে চন্দন মিলনদার উদ্দেশ্যে বলল।

-“আসলে একটা কথা ছিল তোর সাথে। তোর বৌদির শরীরটা ভালো নেই রে। জ্বর হয়েছে, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।আর কালই তোর ভাইঝিকে বই কেনার টাকা দিয়েছিলাম।তাই হাতে …..” পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই চন্দন মিলনদাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে হাত মুছে ক্যাশ বাক্স থেকে পাঁচশো টাকা বার করে মিলনদার হাতে দিয়ে বলল,

“আচ্ছা এতো বছর ধরে তো আমায় দেখছ, আমায় জানো তাও এতো ভাবছ কেন আমায় বলতে। দরকার তো তোমার পরতেই পারে, আর আমি তো তোমার ছোট ভাইয়ের মতো”।এই কথা শুনে মিলনদার মন ভরে গেলো। আর একটু লজ্জা পেয়েই বলল, “আসলে সকাল সকাল টাকা চাইতে এলাম। তাই কেমন খারাপ লাগছিলো”।

-“এবার তুমি বকবক থামিয়ে বৌদিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাও”।

মিলনদা যাবার সময় একটা তৃপ্তিময় হাসি দিয়ে বলল “খুব বুঝিস রে তুই”। বলে চলে গেলো। মিলনদা বেরিয়ে যেতে চন্দন আবার নিজের কাজে মন দিলো।      

।। দুই।।

বেশ কিছুক্ষণ পর চন্দন দেখল মণি হলুদ রঙের চুড়িদার পড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কাঞ্চন কাকার দোকানে আসছে। কাঞ্চন কাকার দোকান চন্দনের দোকানের ঠিক উলটোদিকেই। আসতে না আসতেই কাঞ্চন কাকা মণির ওপর চেঁচামেচি করছিলো দেরি হয়েছে বলে। আর মণি চুপচাপ দাড়িয়ে কাঞ্চন কাকার বকুনি শুনছিল। কাজের ফাঁকে পুরো ঘটনাটাই চন্দনের নজরবন্দী হল। চন্দন ভাবল একটু পরেই তো কাঞ্চন কাকা বাইরে যাবে মাল আনতে তখন না হয় মণির সাথে কথা বলবে। প্রতিমার কাঠামো তৈরির ফাঁকে ফাঁকে মণিকে দেখে খুব কষ্ট হল চন্দনের। বেচারা সাত চরে রা কারে না। যে যা বলে তাই শোনে তাই বোধহয় আজ ওর কষ্ট। কাজ যখন মোটামুটি প্রায় শেষের দিকে তখন চন্দন দেখল কাঞ্চন কাকা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলো। 

-“কিরে চুপচাপ বসে কান্নাকাটি করে কি হবে? একটা কেক এনেছি, এটা খা”। চন্দন কাঞ্চন কাকার দোকানে ঢুকে মণি কে বলল।

-“কাঁদছি কই! আমি তো শোলার কাজ করছি”। চন্দনের দিকে না তাকিয়েই মণি একপ্রকার উত্তরটা দিলো।

-“কষ্ট পাস না। জানিসই তো কাঞ্চন কাকা এমনই,মাথা ঠাণ্ডা হলে আবার ভালও বাসবে”।

-“হ্যাঁ সেই তো, আমি তো পুতুল, যে যখন আসবে বকবে আবার যখন ইচ্ছা হবে দুটো মিষ্টি কথা বলবে”। চোখ মুছতে মুছতে বলল মণি।

চন্দন কথা না বাড়িয়ে কেকটা মণির মুখের সামনে ধরল। এবার মণি মুখ ঘুরিয়ে চন্দনের দিকে দেখল।

-“আমি কিন্তু তোকে পুতুল ভাবি না মনি। এটা খেয়ে নে। খেয়ে কাজ কর”।

চন্দনের এই কথার কোন উত্তর মণির কাছে ছিল না, তাই এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল চন্দনের দিকে।

-“কিরে ধর”।

এবার কিছুটা লজ্জা পেয়েই চোখ নামিয়ে মণি কেকটা নিল।

-“তোমার কাজ কতদূর চন্দনদা ?” নিজের আবেগের প্রকাশ লুকাতেই মণি এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা বলল।

-“এখনো দেরি আছে রে”।

-“আমি জানি চন্দনদা এবারেও তোমার বানানোর মূর্তিই সবচেয়ে সুন্দর হবে। এই এলাকায়ে সবচেয়ে বড়ো মৃৎশিল্পী তুমিই”।

-“না রে,আরো অনেকই আছেন যারা আমার থেকে অনেক সুন্দর মূর্তি বানান”।

-“সে থাকতে পারে।কিন্তু আমার চোখে সবচেয়ে সুন্দর মূর্তি তুমিই বানাও”।

চন্দন এবার মেয়েটার মুখে হাসির ঝিলিক লক্ষ্য করলো। মণিকে হাসলে বেশ মিষ্টি লাগে।

-“আমার প্রতিমাগুলো তো সজ্জিত হয় তোরই বানানো অলংকার দিয়ে। আমি তো শুধু মূর্তি বানাই আর তুই তো তাতে রূপ দিস”।

কথাটা শুনে মণির মন ভরে গেলো কিন্তু এবারও মণি নিজের অনুভূতি গোপন করে বলল, “সে হতে পারে কিন্তু তুমিই সবচেয়ে বড়ো শিল্পী। ব্যাস”!

-“আচ্ছা বাবা আচ্ছা।তাই মানলাম, পাগলি একটা”। বলে চন্দন মণির মাথায়ে একটা আলতো করে চাটি মেরে উঠে গেলো।

।। তিন ।।

-“কিরে মণি কাঞ্চন কাকা এখনো আসেনি?” দোকানে ঢোকার চৌকাঠে দাড়িয়েই চন্দন জিজ্ঞেস করলো।

-“না গো চন্দন দা, কাঞ্চন কাকার আসতে বিকেল হয়ে যাবে। ফোন করে বলল একটু আগে”।

-“দুপুরে খেয়েছিস?”

-“না”।

-“কেন? ভাত আনিস নি?”

-“না। কদিন ধরেই মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। নিজের জন্য করার সময় পাইনি। শুধু মায়ের খাবার মতো রান্না করে দিয়ে এসেছি। তাই তো এতো দেরি হয়ে যাচ্ছে কদিন”।

সবটা শুনে চন্দন বলল, “চল, খাবি আয়”।

-“কোথায়ে যাবো?”

-“আমার দোকানে আয়, আমি ভাত এনেছি”।

-“না না তুমি খাও। আমার পেট ভর্তি আছে”।

-“ঠিক আছে। তুই না খেলে আমিও খাব না”। বলে একটু রাগ দেখিয়েই চলে গেলো চন্দনদা।

এবার যে মণি কি করবে বুঝে পেলো না। চন্দনদা তো শুধু নিজের জন্যই খাবার এনেছে,সেখান থেকে মণিকে দিলে চন্দন দারও তো কম পড়বে।   

তা ভেবে চিন্তে মণি ঠিক করলো সে যাবে, না হলে চন্দন দার খারাপ লাগবে।

-“চন্দন দা আমি এসেছি”। চন্দনের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই মণি বললো। এবার চন্দন হাসি মুখেই মণিকে ভিতরে আসতে বলল। মণি মাদুরে বসলো, উল্টোদিকে চন্দন দা এবং তাদের মাঝে দুপুরের খাবার।

-“এই নে। আজ বেশি কিছু হয়েনি, লজ্জা না পেয়ে খেয়ে নে”। মণি এই কথাটা শুনে মুখে কিছু বললো না। ভাতের থালায়ে ভাত মাখতে মাখতে মনে মনে বললো এইটুকু খেয়ালও কেউ  রাখেনি গো আমার, তুমি ছাড়া। মণির খুব ইচ্ছে করে মনের কথা মুখে আনতে, কিন্তু ভয় পায় বলতে, চন্দন দা জানতে পেরে আর যদি কথা না বলে মণির সাথে! কি করে থাকবে মণি? এই কষ্টের জীবনে চন্দন দাই তো তার একমাত্র সুখের কারণ।

-“কিরে! খাচ্ছিস না কেন? শুধু ভাত মেখে যাচ্ছিস!” চন্দন দার কথায় মণির সম্বিত ফিরল।

-“হ্যাঁ, এই তো খাচ্ছি”।

-“কি ভাবছিস বলতো এখন?”

-“কই, কিছু না তো”।

-“কিছু না বললেই হবে? কিছু তো ভাবছিস”।

এই কথায় মণির উত্তর কি হবে মণির তা জানা নেই। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করলো।

-“দেখ, আমাদের সকলের জীবনেই তো কষ্ট আছে। তার জন্য এতো ভাবনা চিন্তা করলে হবে ! হাসিখুশি থাকবি, দেখবি দুঃখও লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যাবে”। চন্দন দার কথা শুনে মণির একটু হাসি পেলো, মনে মনে ভাবলো তার চন্দন দা তো সব কিছু বোঝে, সবার কষ্ট বুঝতে পারে। শুধু তার মনটাই বুঝতে পারলো না।

।। চার ।।

-“কিরে চন্দন, তোর কাজ কতদূর?” সাইকেল টা চন্দনের দোকানের পাশে দাড় করিয়ে মিলন দা বললো।

-“হ্যাঁ, এই চলছে, প্রতিমাতে মাটির প্রলেপ শুকাচ্ছি। সব মিটে গেলে রং করতে হবে। এই সপ্তাহে মনে হচ্ছে হয়ে যাবে। তা বৌদির শরীর এখন কেমন আছে?”

-“আগের থেকে ভালো আছে রে। তোর বাড়ির সবাই ভালো তো? আর তোর ভাইয়ের কি খবর?”

-“ হ্যাঁ গো মিলন দা সবাই ভালো আছে। আর ভাই তো আমেরিকাতে। এইসব কাজই তো ও করে”।

একটা বিড়ি ধরিয়ে তাতে সুখটান দিয়ে মিলন দা বললো, “বলিস কি! বাবলু এখন আমেরিকায়ে মূর্তি বানানোর কাজ করছে! বাহ! খুব ভালো। তা তুইও তো দারুন কাজ করিস, ভাইকে বলে একটা ব্যবস্থা পাকা করে চলে যা”। চন্দন মিলন দার কথা শুনে হেসে বললো, “কি যে বলো না তুমি! আমার ভাই মূর্তি বানানো নিয়েই অন্য কাজ করে। অনেক নতুন নতুন কাজ করে। আমায় বলেছিল কিন্তু আমি ওসব ঠিক বুঝতে পারিনি”।

-“তা তুইও তো তাই করিস। তুইও যা। ভালো কথা বলছি। এখানে কিছু হবে না । এখানে একটি ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিয়ে ওখানে গিয়ে কাজ কর। জীবনে উন্নতি হবে”।

আবার চন্দন হেসে বললো, “কি সব যে বলো না! আমার ভাই ভগবানের মূর্তি বানায় না, ও মানুষের মূর্তি করে। আমার ওখানে গিয়ে কিছু হবে না। আর বিয়ে কি করবো এখন! আগে একটু এখানে গুছিয়ে নিই, তারপর তো। আর তাছাড়া বিয়ের জন্য একজন সুপাত্রীর দরকার হয়। সে কে দেবে শুনি?”

মিলন দা পোড়া বিড়ি মাটিতে ফেলে চটি দিয়ে ঘষে কিছুটা অবাক হয়েই বললো, “বলিস কি! পাত্রী তো তোর চোখের সামনেই”। কাঞ্চন কাকার দোকানে তাকিয়ে মণির দিকে ইশারা করে মিলন দা আমায় বোঝালো।

-“মণি?”

-“ হ্যাঁ। ওর কথাই বলছি”।

-“ধুর! তুমি যে কি বলো না মাঝে মাঝে। তোমার শুধু সবসময় ইয়ার্কি। ওর বয়স ঐ উনিশ হবে। আমি ওর থেকে প্রায় দশ থেকে এগারো বছরের মতো বড়ো। আর তুমি কিনা বিয়ের কথা বলছো!”

এবার উত্তেজিত হয়ে মিলন দা বলেই দিলো, “তাতে কি পাগলা! ভালোবাসা বয়স দেখে না। তোর বৌদি ও তো আমার থেকে দশ বছরের ছোট। তা বলে কি বিয়ে হয়েনি, নাকি ভালোবাসা নেই?”

-“না গো, মিলন দা এটা সেইরকম না। আমি জানি মণি খুব ভালো মেয়ে। কিন্তু ওর সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, প্রেম হয়েনি”।

এবার মিলন দা হতাশ চিত্তে দোকান থেকে উঠে যাবার সময় বললো, “দেখ বাপু, ভালো কথা বলছি। ভেবে দেখতে পারিস। এই যুগে ভালো জীবনসঙ্গিনী পাওয়া কিন্তু ভাগ্যের কথা”।

মিলন দার শেষের কথাটাই কেমন যেন মনে লাগলো চন্দনের। আবার নিজের কাজে মন দিলো চন্দন। কদিন পরেই তো প্রতিমা রঙিন করতে হবে। আর তারপরেই বাঙালীর শ্রেষ্ঠ পুজো দুর্গাপুজো।

রচনা – দেবশ্রী

পরবর্তী পর্ব আগামি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে।

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

1+

Leave a Comment

error: Content is protected !!