ছেলেবেলার বৃষ্টি

14+

আষাঢ় মাসের শুরুতেই সেবার বর্ষা এসেছিল আমাদের গ্রামে।তিনদিন টানা বৃষ্টির পর বন্যা, তখন যদিও প্রতিবছরই অল্প বিস্তর বন্যার পরিস্থিতি হতো।তিস্তার ত্রাস আর উপচে পড়া জলে নিচু এলাকাগুলি প্রায় ডুবেই যেতো।যদিও আমাদের বাড়ি সেই এলাকায় নয়, তবুও বর্ষাকালে উঠোনে জল হতো, পেছনের পানাপুকুর হয়ে সেই জল আমাদের আশেপাশের বাড়িগুলো বেয়ে এসে সামনের ডোবায় পড়তো।বাড়ির উঠোন পেরিয়ে অন্যত্র যাওয়ার উপায় থাকতো না,বাড়ির বড়রা এতে খুব বিরক্ত হতো।আমার কাছে কিন্তু এই বর্ষার দিনগুলি এক অন্য মাত্রা পেতো, ইস্কুলও ছুটি তাই সারাদিন বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখা তবে তার চেয়েও অমোঘ আকর্ষণের বিষয় ছিল সেই জলে মাছের আনাগোনা ।খুব ছোট ছোট পুঁটি মাছের ঝাঁক চোখের পলকে এপার-ওপার সাঁতরে বেরোতো।বৃষ্টি থামলেই আমি মায়ের চোখ আড়াল করে সেই থৈথৈ জলে মাছ ধরার আশায় নেমে যেতাম।ওদের ধরা তো দূর বরং আমি নিজেই সেই জলে উল্টে পরে গিয়ে ভিজে কাক হয়ে মায়ের কানমলা খেয়ে উঠে আসতাম।কিন্তু মাছ ধরার অপ্রতিহত জেদ আমার মাথায় চেপে বসলো, উপায় বার করতে আরম্ভ করলাম। প্রথম চেষ্টায় এক লাঠির ডগায় সুতো বেঁধে বারান্দা থেকে জলে ডুবিয়ে দিলাম, কিন্তু মাছ উঠলো না।আচ্ছা,আমি যদি ছাতা মেলে জলে ডুবিয়ে রাখি আর মাছ যখনই সেই ছাতার ওপরের জল দিয়ে যাবে অমনি ছাতা তুলে নেব! তাতে আমার একেবারে একঝাঁক মাছ ধরা হয়ে যাবে! যেমন ভাবনা তো তেমন কাজ,এবারের বর্ষায় নতুন কিনে আনা মহেন্দ্র কোম্পানির ছাতা নিয়ে গেলাম আবার মাছ ধরতে।মাছ ধরা তো হলোই না কালো ছাতার শ্রাদ্ধটা সেরে দিলাম।।কিন্তু তাই বলে জ্যান্ত মাছ ধরে কি পুষতে পারবো না?অনেক কান্নাকাটি করে পুরোনো একটা মশারির জাল কেটে মা গুলতির আকারের লাঠির মাথায় বেঁধে দিয়ে বললো, এতে নাকি আমার জলে না নেমে জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়ে যাবে।কিন্তু কই? দিনরাত বসে থেকেও মাছ পেলাম না,বরং জলের মাছগুলো যেন বিকট ভঙ্গি তে আমার এই অসহায় দশা দেখে ব্যঙ্গ করছে।এদিকে জলও প্রায় শুকিয়ে এসছে, উঠোন জুড়ে কাদা কাদা।আমিও ইস্কুলের পড়াশোনার দিকে মন দিলাম।একদিন সন্ধেয় বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে দেখি উঠোনের মাঝখানে কি একটা লাফাচ্ছে,ওমা!এ যে মাছ!আজ তো আমি ধরেই ছাড়বো।কিন্তু এটা তো পুচকি মাছ নয়, একটু বড়ো।মা ,মা, করে চিৎকার করলাম, মা এসে মাছ ধরে দিলো।নতুন কাঁচের বয়ামে রাখলাম, আর মুড়ি বেটে খেতে দিলাম।এভাবে চলতে থাকে তিন-চার দিন।তখন আমি দ্বিতীয় ক্লাসের বাচ্চা, সামনেই পরীক্ষা। সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেই মাছ দেখা এখন আমার অভ্যেস ।বারান্দায় বয়াম রেখে গেলাম ইস্কুলে। এসে বয়ামের কাছে যেতেই দেখি সব একই আছে কিন্তু মাছ নেই।মা ফেলে দিলো না তো! কিন্তু না, উঠোনে খুঁজতে খুঁজতে দেখি একস্তূপ ঘাসের মধ্যে মরে পরে আছে ও, চারদিকে লাল পিঁপড়ের দল ওকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। থমকে গেল আমার দেহ । দুই চার দিনের হলেও বড়ই মায়া ছিল ওর ওপর। আমার সাময়িক সুখের জন্য একটা জীবন চলে গেল।হয়তো শুধু মানুষ নয়,ওদেরও আছে পরিবারের মায়া, তাইতো এই বদ্ধ, সঙ্গীহীন জীবন ছেড়ে স্বাধীন জীবনের উদ্দ্যেশে যাত্রা করেছিল ও । আর আমার জীবনের একটা পাতায় লিখেছিল স্বাধীনতার মূল্যবোধের কাহিনী।।

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

14+

2 thoughts on “ছেলেবেলার বৃষ্টি”

  1. খুব ভালো লাগলো। লেখকের অনুভবের অনুরণন স্পষ্ট লেখায় ।

    1+
    Reply

Leave a Comment

error: Content is protected !!