ডায়েরির কবিতা

8+

কবিতা কখনো কারোর অনুভূতি-আবেগকে কোলে তুলিয়া লয়। সে কোনো ঘটনার প্রতিচ্ছবি তুলিয়া ধরিতে পারে। কখনো সে ব্যঞ্জনাও প্রকাশ করিতে পারে। কিন্তু সে কখনো দুই পারাবারের সংযোগসূত্র হতে পারে কি? হ্যাঁ, তাহাও হয়তো সম্ভব।

“মহামারীর সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশকে রক্ষা করিতে সমগ্র দেশজুড়ে লকডাউন জারি করা হইল ” সংবাদপত্রের বারতার উপর দৃষ্টিপাত করিয়াই চিন্তার ছায়া পড়িল নিবারণের উজ্জ্বল ললাটে। নিবারণ মিত্র খুবই কর্মপ্রিয় মানুষ বটে। সে এক পত্রিকায় সম্পাদনার কাজ করে, নাম ‘নবমঞ্জরী’। কর্মের প্রতি তাহার রয়েছে অসম্ভব নিষ্ঠা।তবে তাহার পাশাপাশি এক বছর হতে যায় দাম্পত্যের বন্ধনেও আবদ্ধ হয়েছে সে।কিন্তু কর্মজীবন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে, যে বাড়িতে দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি যেন তাহার দৃষ্টিগোচরই হয় নাই। হ্যাঁ, এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হলেন তাঁহার স্ত্রী মণিমালা মিত্র। মণিমালা অবশ্য নিবারণকে হৃদয় থেকে ভালোবাসিত।কিন্তু নিবারণের মনে স্ত্রীর প্রতি কখনোই প্রেমের সঞ্চার হয় নাই। তবে নিবারণের তাহার প্রতি নীরব উপেক্ষা যেন তাহার হৃদয়কুঠুরিকে স্পর্শ করিতে পারিত না। স্ত্রীর প্রতি নিবারণের প্রতিটি বক্তব্য যেন ছিল স্নেহ-ভালোবাসার বরষ। কিন্তু তাহার পৃথিবীর প্রধান সেতু এখনো যে গড়ে ওঠে নাই। তাহার মন-নিকেতনে কোথাও ভালোবাসার সেই আকাঙ্ক্ষা যেন অতৃপ্তই রয়ে গিয়েছিল। মন তো গাছের ফুল নহে,তুলে নিলেই তোলা যায় না। সেই ক্ষুধিত অব্যক্ত আশা তাহার সমগ্র শরীরকে প্রায় জীর্ণ করিয়া তুলিয়াছিল। সেই চিত্র অন্তর্যামী ব্যতীত আর কেহ দেখিতে পাইল না। কাকে বলিবে সে,তাহার এই বেদনা!!

তবে কে জানিত,এই বেদনার চিহ্নই একদিন সমস্ত বেদনাকে পরাভূত করে, সকল জীর্ণতাকে বিদীর্ণ করে দিবে। হ্যাঁ, সময় চুপিসারে সকলই জানিত ঠিকই, তবে সে কাহাকে বলেও নাই।

আজ হয়তো সমগ্র এই পৃথিবীর নেতিবাচকতাই কোথাও যেন ইতিবাচকতাকেও বহন করিয়া নিয়ে আসে। কোভিড-১৯ এর মড়কে সংক্রমণের আশঙ্কায় যখন সারা দেশজুড়ে লকডাউন জারি করা হইল, তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই গৃহবন্দি হতে হইল মানবজগতকে, তাহা নিজেকে রক্ষা করিতে হউক, বা অপরকে রক্ষা করিতে। গৃহবন্দি অর্থাৎ ইংরাজিতে যাকে বলে কোয়ারেন্টিনে যেতে হইল সকলকেই। নিবারণও তাহার ব্যতিক্রম নহে। সম্পাদক কাজ তখন আপাতত স্তব্ধ। কী করিবে? তাই বাড়িরই বিভিন্ন কাজ করিত, পাশাপাশি গল্পের বই পড়িতেও বেশ ভালোবাসিত নিবারণ। বাড়িতে ছিল তাঁহার প্রচুর গল্পের বই। বাড়িতে থাকাকালীন এই গল্পের বইগুলিই তাহার সঙ্গী হয়ে উঠিল। পড়িতে পড়িতে একদিন বইয়ের তাকে একটি ডায়েরি আবিষ্কার করিল সে। সেই ডায়েরির মলাটের উপরে লেখা রয়েছে ‘অনুভূতির অতিথি’। কৌতূহলী চোখে সেই ডায়েরিতে দেখিল নানান কবিতা, কিন্তু এতো তাহার লেখা নহে!! “তবে মন্দ নহে!” বলিল সে। পড়িতে পড়িতে শেষ কবিতায় আসিয়া উপস্থিত হইল,যা তাহার মনে বিস্ময়ের উদয় ঘটাইল –

“হে ঈশ্বর, মোরে লুটায়ে দাও আজি তব ভূমিতলে,
দীর্ণ করিয়া দূর করো ওহে প্রতিটি সজল পলে।
সকল স্বপন করেছি বপন কেবল তারেই ঘিরে,
যতন করিয়া মাঝারে রেখেছি শত মানুষের ভিড়ে।
তবুও তারে পাইনি আমি, হায় এ অভাগিনী,
প্রেমের পরে কর্মের চরণ রাখিছে দিবস-রজনী।
ঘাতে-প্রতিঘাতে গোপন দ্বন্দ্বে প্রেম হয় তবে মূক,
চারিদিকে যেন প্রাচীর উঠিছে,কভু প্রবেশ পায়নি সুখ।
নয়ন সলিলে সিক্ত সকল আমার ভুবনে-ভবনে,
ডেকেছি তাহারে নীরবে যে আমি ধ্বনিত আর্দ্র পবনে।
আমার চিতের দেবতারে চাহি বসাতে তোমার মন্দিরে,
পূজার অর্ঘ্য রচিব যে নিতি তোমার হৃদয়-বন্দরে।
নিবারণ তব নিবারণ করো সকল ধূসর গোধূলি,
সাজাও চিত্ত আলোকমালায় প্রদীপের শিখা জ্বালি!!”

তাহার নীচে লাল কালিতে লেখা ‘ রচনায় মণিমালা মিত্র’। তাহার বুঝতে অসুবিধা হয় নাই যে এটি তাহার উদ্দেশ্যেই রচিত এবং তাহার স্ত্রী এটি লিখিয়াছে। নিবারণ এবারে উপলব্ধি করিতে পারিছে যে,কর্মের বৃহৎ জগতের দিকে ছুটিয়া ছুটিয়া সে মণিমালার পানে ফিরে তাকায় নাই। আজ যেন সে ফিরিয়া মণিমালার মুখখানি স্পষ্ট দেখিতে পাইছে। তাহার নয়নদুটি যে এখনো জলের ফোঁটায় ভরা, সেই জলে একটি অব্যক্ত তৃষ্ণা পলকে পলকে ফুটিয়া উঠিতেছে। তাহার নয়নে নয়ন মেলিয়া আজ তাহার নিজের চক্ষুদুটিও ভিজিতেছে,ক্রমশ যেন সিক্ত হইয়া আসিছে। সে তাহার ভুল বুঝিতে পারিয়াছে, সে বুঝিতে পারিছে যে, “আমি কত না তারে কষ্ট দিয়েছি,কত না তারে দগ্ধ করেছি!! ধিক্কার!!” এমন সময় মণিমালা ঘরে প্রবেশ করিল,স্নিগ্ধনেত্রে চাহিয়া দেখিল তাহার চোখে জল। সে জিজ্ঞাসা করিল, ” কী হয়েছে? তোমার চোখে যে জল ! কিছু হয়েছে ? ” প্রশ্নের উত্তর আসিবার পূর্বেই তাহার চোখ পড়িল ডায়েরির দিকে, সে বুঝতে পারিল কী হয়েছে! তখন নিবারণ তাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বলে দাও তুমি মণি, কী করব আমি? কী করলে আমার এই দোষকে আমি স্খালন করতে পারি, বলে দাও তুমি, বলো আমাকে! “,বলিতে বলিতে সে কেমন যেন চঞ্চল হইয়া উঠিল। তখন মুহূর্তের মধ্যেই মণিমালা তাকে আলিঙ্গন করিয়া বলিল, “দাও, তারে দাও তুমি আজ আমাকে!! ওই ভালোবাসার বসন-ভূষণে আমাকে সাজিয়ে তোলো তুমি আজ ! ” আজ যেন তাহার সমস্ত অশ্রুজল মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হইয়া মিলিয়া যাহিতেছে বাতাসে। সকল আঁধার অতিক্রম করিয়া তপন আবার পূবের গগনভালে আসিয়া উপস্থিত হয়েছে। নিবারণ বলিল, ” দিব তোমারে তাই, নিবারণ করিব তোমার সকল যাতনা !! ” বলিতে বলিতে সে মণির অশ্রুজলসিক্ত ওষ্ঠাধরে মিলন-চুম্বন বর্ষণ করিয়া দিল,যা দীর্ঘ বরষের অবসান তথা সমাপ্তি ঘটাইল।

8+

Leave a Comment

error: Content is protected !!