ঘরের মেয়ে শ্রুতি

2+

লেখার অভ্যাসটা ছেড়েছি বহুকাল। ডায়েরিগুলোর স্থান এখন আলমারির কোনায়। কোনোটা ধুলোয় মাখা, আবার কোনোটা বা নগ্নাবস্থা। হঠাৎ সেদিন স্মৃতিচারণ করতে ইচ্ছে হলো। বসলাম কাগজ, কলম নিয়ে। পাশে রাখলাম লাল মলাটের পুরনো সেই ডায়েরি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা আসন্ন। আকাশটা লাল হয়ে আছে, যেন কেউ এসে আবির ঢেলে দিয়েছে। মনে এলোমেলো কত কি আসতে থাকলো কিন্তু কি লিখবো বুঝে উঠতে পারলাম না। সেই সময় ইলেকট্রিকটাও গেলো চলে। হঠাৎ যেন সমস্ত আকাশ গর্জে উঠলো একসাথে। ধ্বনিত হল এক ভয়ংকর শব্দ। বাতি নিয়ে ঘরে ফিরে দেখি পুরনো ডায়েরির পাতাগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেছে আর তার ওপর খেলা করছে একগুচ্ছ জলরাশি। যেন অতীত কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে পাতার ওপর। আর এতেই মনে হল এসব লেখা-টেখা আর  আমার জন্য নয়, আর সেটা বোঝাতেই জলরাশিগণের আগমন এই অসময়ে। তাই আর দুঃসাহস দেখাতে গেলাম না। বন্ধ করলাম লেখা। চোখ পড়ে গেলো ডায়েরির হলুদ হওয়া একটা পাতার দিকে। যেন এক মুহূর্তে পিছিয়ে গেলাম অনেকটা। মনে পড়ে গেলো শ্রুতি মল্লিকের কথা। হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন আপনাদের সকলের ‘ঘরের মেয়ে শ্রুতি’, তার কথাই বলছি আমি। শুধু ডাক্তার হিসেবে নয়, প্রতিটি অসহায় পরিবারের সদস্য এখন সে। ওর সাথে আমার পরিচয় বহুকালের, যখন ও ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি। যখন ও টালমাটালি পায়ে হাঁটত, তখন দেখে মনে হতো সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে পেতে চায় হাতের মুঠোয়। যেন ছুটে যেতে চায় পৃথিবীর এক কিনারা থেকে অন্য কিনারায়। জিজ্ঞাসু চোখে সবসময় লেগে থাকতো প্রতিবাদের ভাষা। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তার মন। জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, বহুদুর যেতে হবে এটা ছোট্ট থেকেই ছিল তার প্রতিজ্ঞা। ঘটনাবহুল এ সমাজকে দেখে জীবনকে নিয়ে একটা ধারণা তৈরি করেছিলাম আমি। সেখানে জীবনের শুধু তিনটি স্তর। যেমন ধরুন বস্তুবাদী স্তর (Materilistic layer) ধন-সম্পদ-আকাঙ্খা নিয়ে। গোপনীয় স্তর (Confidential layer) ও আধ্যাত্মিক স্তর। এগুলো কোনো লেখা বা পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জীবন সম্পর্কে আমার ব্যাক্তিগত ধারণা। মানুষ না চাইলেও এই দিকগুলিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে মানুষকে। কখনো এর ফল হয় ভালো আবার কখনো বা খারাপ। কিন্তু খুব কম মানুষকে দেখলাম জীবনে যারা এইসমস্ত স্তরের ভালো দিকগুলোকে জীবনের প্রেরণা হিসাবে কাজে লাগিয়ে বহুদুর এগিয়েছে। এই কম মানুষের মধ্যে শ্রুতি ছিল অন্যতম। তার পরিবার বলতে মা,বাবা আর তার দিদি। বেশ ছিল তাদের সংসার। জীবন তাদের প্রথম পরীক্ষা নিলো যখন শ্রুতি মাত্র চার বছরের। একেই হয়তো বলে ভাগ্যের পরিহাস। শ্রুতি জানতে পারলো তার একান্ত আপন বাবার দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। কলকাতার সব নামী দামি ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিতে লাগলেন। আশানুরূপ আশ্বাস দিতে পারছিলেন না কেউই। তাহলে এইখানেই কি শেষ সব আশার! সব পথ কি থেমে যাবে এখানেই! ‘না’এটাই শেষ নয়। প্রবল বর্ষণে বর্ষাতির মতো পরিবারের দুই ছোট মেয়ে আর স্বামীকে রক্ষা করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন শ্রুতির মা। নিদারুণ কঠিন সে সংগ্রাম। পাশে ছিলো না আর কেউই। কিন্তু আশা হারাননি তারা। তাদের সৎ আশায় অবশেষে তাদের পরিচয় হল দেবতুল্য সেই ডাক্তারের সাথে, যার পরামর্শে কিডনি Transplant করা হয় শ্রুতির বাবার। সুস্থ হলেন তিনি। মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এলেন তিনি। তারপর থেকেই শুরু হল জীবনে প্রতিষ্ঠা হওয়ার লড়াই। অনুকূল ছিল না সেই পথ। কিন্তু হাল ছাড়েনি সে আর তার জীবন এগিয়ে যাবার প্রতিটি পথে প্রেরণাদাতার ভূমিকায় ছিলেন তার বাবা। কিন্তু শ্রুতি ও তার পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষরক্ষা করতে পারলো না শেষপর্বে। পরিবারের সবাইকে ছেড়ে একা করে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন শ্রুতির বাবা। আবার ভেঙে পড়লো শ্রুতির পরিবার। ফিরে এলেন না আর শ্রুতির বাবা। শুধু ফিরে এলো প্রেরণাসমূহ বাবার সেই কথাগুলি। তবে এখানেই কি শেষ সব! সব স্বপ্ন! সব আশার দরজা কি এখানেই বন্ধ! বাস্তবের নিয়মানুসারে হয়তো সেটাই। কিন্তু এখানেই শ্রুতির সঙ্গে অন্যান্য মেয়েদের পার্থক্য। শ্রুতি থেমে থাকেনি, শ্রুতি বুঝেছিলো তাকে বড়ো হতেই হবে। ডাক্তার হতেই হবে। আজ যে বাবাকে সে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারেনি সেরকম কোনো বাবা, কোন মা, কোন ভাই কিংবা কোন বোনকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতেই হবে তাকে। যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলো সে কারুর সাধ্য ছিল না তাকে আটকানোর। সব প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে জয়ী হয় সে। পথটা সহজ ছিলোনা মোটেও, তবুও হার মানেনি সে। আজ সে বড়ো নামকরা ডাক্তার হয়েছে, সবাই চেনে তাকে। ভালবাসে তাকে। সত্যিই তো শ্রুতি সেই মেয়ে যাকে দেখে সবাই বলবে, “মহামেঘপ্রভানং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভূজং, কালিকাং দক্ষিণাং মুক্তমালা বিভূষিতাং”।

হয়তো শ্রুতিই আজ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেলো নিজের লক্ষ্য স্থির থাকলে যেকোনো বাধাই আসুক না কেন সব বাধা পেরিয়ে নিজের লক্ষ্য পূরণ হবেই হবে।

রচনা – মেঘা লাহা

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

2+

3 thoughts on “ঘরের মেয়ে শ্রুতি”

Leave a Comment

error: Content is protected !!