তার আর পর নেই

0

৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

আজ সুমনার বিয়ে, সকাল থেকেই ধুমধাম পর্ব চলছে, ওই যেমন চলে একটা আদর্শ রুচিসম্মত বিয়েবাড়িতে। লোকজনের আসা, ভিড়, বহুদিন পড়ে অনেকের সাথে দেখা হওয়া। সুমনা মনে মনে ভাবছে, এটাই তো সে চেয়েছিলো, একজন সরকারি কর্মচারী, এইবার বন্ধুদের বলতে তো পারবে। সেপ্টেম্বর মাসে যেদিন রেজিস্ট্রি হল সেদিন সকালে একবার দেবাশীষের অ্যাকাউন্ট টা খুললো, এতদিন ব্লক করা ছিলো। ডিটেইল টায় লেখা যে works at MNC since April 2016। যাক বাবা, ল্যাঙ্গোটটা চাকরি পেয়েছে। তারপর ভাবলো, কেনোই বা দেখছে। এই ছেলে তার হবু স্বামী সব্যসাচীর কাছে কিছুই না। কি নেই সব্যসাচীর? একান্নবর্তী পরিবার, নিজের চাকরি, কি নেই? মনে আছে একবার, যখন দেবাশীষের সাথে ওর জমে উঠেছে, তখন ওর এক বান্ধবীর হবু স্বামী বান্ধবীকে একটা রূপোর নোট আর একটা ব্ল্যাকবেরী ফোন গিফট করেছিলো। দেবাশীষও বলেছিলো, “চাকরী পাই, বিয়ের আগে তোমাকেও আমি আরও দামী একটা জিনিস দেবো”। ভাগ্যিস সম্পর্কটা শেষ করেছে, আর ভাগ্যিস সব্যসাচী এসেছে জীবনে। যাক্ গে, প্রোফাইলটা ব্লক করলো না, দেখুক ওর কেমন বড়লোক পরিবারে বিয়ে হচ্ছে। ওদের একটা চাকরের মাইনে যা, দেবাশীষের মাইনে তার থেকেও হয়তো কম। এবার আর কোনো বাধা নেই, সব্যসাচী হয়তো ওর কেরিয়ারের ব্যাপারে সবসময় ওর পাশে থাকবে। আজ থেকে ও শুধু সব্যসাচীর।

৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

“ভাই, অনেক দেবদাস দেখেছি, তোর মতো এমন দেবদাস দেখিনি”, ক্যারামে এক শটে দুটো সাদা ঘুটি ফেলে বললো রিমো।

“না রে ভাই, পৃথিবীর ওই একটি কাজে আমি সর্বভীতু”, পরের কালো ঘুটি ফেলে দেবাশীষ বললো, “তোর কি মনে হয় এই ঝোড়ো কাকের মতো থোবড়াকে কেউ বিয়ে করবে? ওসব ছাড়, আজ সকালে একটা নতুন ডিল ক্র‍্যাক করেছি, দেখবি এই ছ’মাসে কোম্পানির প্রফিট কোথায় পৌঁছোয়”।

এ’কথা সেকথা সেরে দশটার সময় দেবাশীষ বাড়ি এলো। আজ সে খুব ক্লান্ত, এই ডিল ক্র‍্যাক করার জন্য সে দেড় মাস ধরে চেষ্টা করেছে, আজ সে সফল। চটপট ডিনার সেরে নিজের ঘরে ঢুকলো, তার আজকের তারিখটা দিব্বি মনে আছে। কাল ৪ঠা, কাল সুমনার জন্মদিন। প্রতিবার ও ঠিক রাত বারোটায় সুমনার দেওয়া সেই ডায়েরিতে সুমনার নাম লেখে, ওর প্রথম প্রেমের নাম। আজ এত বছর ওদের ব্রেকআপ, দেবাশীষ কিন্তু ভোলেনি। বছরের ওই একটা দিনই রাত বারোটার পর একবার সুমনার প্রোফাইলটা ও খোলে, একমনে একপলকে দেখে ওর সেই সুমনা কে, ঠিক এটাই সেই কারণ যে কারণে ও আর বিয়ের কথা ভাবেনা, ঠিক এটাই সেই কারণ যার জন্য ও আজ একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির কি অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার, একজন সাকসেসফুল মেরুদণ্ড সোজা ব্যক্তি। খুললো প্রোফাইল, ডিটেইলে লেখা house wife। সে মনে মনে হাসলো, হায় রে কপাল। দেবাশীষের সাথে থাকলে নাকি সুমনার কেরিয়ার নষ্ট হবে, একটা মেরুদণ্ডহীন ছেলের জন্য নিজের কেরিয়ার নষ্ট তো হতে দেওয়া যায় না। প্রেমটা এসেছিলো, বসন্তের হাওয়ার মতো, যখন বুঝতে শিখলো তখন দেরী হয়ে গেছে। দেবাশীষ একটা কথাই বলেছিলো শেষে, কাগজের ন্যাপকিনে লিখে, “all the best”। এত কিছু ঘটে গিয়েও শেষমেশ তাকে house wife-ই হতে হলো।

তারপর?

তার আর পর নেই।

রচনা – দেবাঞ্জন

আপনার লেখা এখানে প্রকাশিত করার জন্য  নীচের বাটন-এ ক্লিক করুন

0

Leave a Comment

error: Content is protected !!