ঘরে ফেরার গল্প (সত্য ঘটনা)

18+

সারা বিশ্বে এখন চলেছে যুদ্ধের প্রস্তুতি শত্রু করোনা ভাইরাস-এর বিরুদ্ধে। লকডাউন যাপন করতে অভ্যস্ত হয়েছে মানুষ। ঘরে ফেরার স্রোতে ভেসে চলেছে পরিযায়ী শ্রমিকের দল, সঙ্গে নিয়ে  নভেল করোনা ভাইরাসের বিষাক্ত হাওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই। কত মৃত্যুর মিছিল, কত ক্ষুধার আর্তনাদ, কত স্বজন হারানোর শোক ভরিয়ে ফেলেছে এই ফেরার পথকে। এই চলার পথে আছে কত মূমুর্ষু রোগী তাদের পরিজন, কত শ্রমিক, আর আছে পর্যটক-তীর্থযাত্রীর দল। আচমকা লকডাউন ঘোষণা প্রশাসনের ঠিক কি বেঠিক এর বিচার করা সাধারণ মানুষের হাতে নয়, তবে এই বিভ্রান্ত মানুষদের হাহাকার সমগ্র ভারত তথা বিশ্বের ওপর মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। যে কথা বলব বলে এই সূচনা দিয়ে শুরু করলাম, আসলে আমরাও হয়ে যেতে পারতাম এই দূর্দশাগ্ৰস্ত মানুষদের সহযাত্রী।

নভেল করোনা ভাইরাস নামে জীবাণুর বিশ্বব্যাপী দাপাদাপি ততদিনে শুরু হয়ে গেছে। প্রথম চমক লেগেছিল যখন খবরের পাতায় জানা গেল বিশ্বভারতীর দোল উৎসবের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে যাবার পর, অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে। সেটা সম্ভবত মার্চ মাসের নয় তারিখ হবে। আমাদের এগারো জনের দল, সঙ্গে এক দেড় বছরের শিশু সাথী, বেনারস যাব মার্চ মাসের বারো তারিখ, টিকিট কাটা, থাকার জায়গা ঠিক করা, সেসব জানুয়ারির শেষ সপ্তাহেই হয়ে গেছে। এদিকে করোনা ভাইরাসের দাপটকে রোখার জন্য বিশ্বের দেশগুলো যে যার মতো ব্যবস্থা নিয়ে চলেছে। মার্চ মাসের এগারো তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মহামারী আকার নিয়েছে বলে ঘোষণা করলেন। আরো জানার বিষয় হল মূলত এই রোগের জীবাণু নাক-মুখ দিয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে প্রথমে গলায় সংক্রমিত হয়ে খুবই দ্রুত শ্বাসযন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে পৌঁছে দেয়। সাবধানতা হিসেবে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাতে স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, নাকে মুখে হাত না দেওয়া। নাক-মুখ চাপা দেবার গুরুত্ব তখনও ভাইরাল হয়নি। ঠিক আছে, কুছ পরোয়া নেহি, এইভাব নিয়েই, হ্যান্ডব্যাগে হ্যান্ডওয়াশ ইত্যাদি নিয়ে বারো-ই মার্চ রাত্রি আট-টায় সদলবলে বেনারসগামী ট্রেনে উঠে বসলাম।

যথা সময়ে বেনারসে নেমে অটো পথে যাব চৌষট্টি-ঘাটের ওপর সীতারামদাস ওঁকারনাথজীর আশ্রমে। আশ্রমের অধ্যক্ষ ফোন করে জানালেন বড় রাস্তার উপর ওনার নির্দেশ অনুযায়ী দাঁড়িয়ে থাকতে। মুখে মাস্ক লাগানো দুটি ছেলে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত, পোশাক দেখেই চেনা গেল আশ্রমবাসীদের। তাদের অনুসরন করতে গিয়ে কাশীর গলির ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেল শুরুতেই। যাই হোক গলির বাঁক, বাঁকের মুখে আবার গলির শুরু এইভাবেই গলির মুখে ঢুকে আশ্রমের দরজায় পা রাখলাম।

অন্দরে ঢুকেই মনটা শান্তিতে ভরে গেল। গঙ্গার উপর, অনুপম দৃশ্যপট, অপার নির্জনতা, স্নিগ্ধ শীতল হাওয়ায় শরীর জুড়োলো। মনের কোনে কোথাও করোনার করাল উপস্থিতি ঠাঁই পাইনি। একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই প্রকৃতির কোলে মানুষ উচ্চ বুদ্ধি সম্পন্ন কীট মাত্র। যুগ যুগ ধরে বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা কত বিচিত্র ভাইরাস, অনুপরমানুর আবর্তের মধ্যে পৃথিবীর জীবকুল প্রান ধারনের জন্য লড়াই করে চলেছে। প্রাণী কুলের সর্বশেষ নিয়ন্তা এই বিশ্ব প্রকৃতির মহাশক্তি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার ওপার পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে এইসব ভাবনায় হারিয়ে গেলাম।

ডাক এল খেতে যাবার, আজ আশ্রমে  প্রসাদ পেলাম, এককথায় সাত্ত্বিক ভোজন, আত্মতৃপ্তি হলো। বেলা তিনটের মধ্যে সারনাথ দর্শন করতে বেড়িয়ে পড়লাম সদলবলে। এখানে পর্যটক খুবই স্বল্প সংখ্যক চোখে পড়ল। বুদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তির দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা জানালাম এই বিশ্ব কলুষমুক্ত হোক। শুদ্ধ, পবিত্র হোক আমাদের মনপ্রাণ। বেশ হালকা ফুরফুরে  মন নিয়ে ওখান থেকেই সোজা দশাশ্বমেধ ঘাটে গিয়ে পৌঁছলাম। ধীরে ধীরে গঙ্গা আরতির আয়োজন শুরু হয়েছে, সুষ্ঠুভাবে আরতি দর্শনের ইচ্ছাপূরণ করতে আমরা নৌকায় উঠে বসলাম। আলোর ছাতা দিয়ে সাজানো ঘাট। বেশ আনন্দে মেতেছি সবাই, কিন্তু বাধ সাধল প্রকৃতি দেবী স্বয়ং, ক্ষনিকের মধ্যে আকাশ গেল কালো মেঘে ছেয়ে, শুরু হলো বজ্রবিদ্যুৎ যোগে তুমুল বৃষ্টি। হুড়োহুড়ি ছুটোছুটি করতে গিয়ে এগারো জনের দল ভাগ হলাম তিন ভাগে, সঙ্গে শিশু সাথীটি-ও আছেন। দুর্যোগ শেষে সব মিলন হল গোঁধূলিয়ার মোড়ে। সেখান থেকে যাওয়া হল বিশেষ আত্মীয়ার বাড়ি নৈশভোজের নিমন্ত্রণ রক্ষায়, এটা আগে থেকেই ঠিক ছিল। মার্চ মাসের তের তারিখ পার হল। আগামীকাল বিশ্বনাথ দর্শন দিয়ে দিন শুরু হবে।

আজ চোদ্দ-ই মার্চ, সকাল আটটার মধ্যে গঙ্গা স্নান সেরে জয় বাবা বিশ্বনাথের নাম নিয়ে সোজা মন্দিরের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। যথা সময়ে শিবের মাথায় জল দিয়ে পুজোর ডালি নিবেদন করে মনের আশা মিটল। এবার অন্নপূর্ণা মন্দির দর্শন ও পূজাপাট শেষে, ঠিক হল নৌকা যোগে বেনারসের বিখ্যাত ঘাট গুলি দর্শন করব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পঞ্চগঙ্গার ঘাট, এই ঘাটের উপর কাশীর সচল বিশ্বনাথ বাবা ত্রৈলঙ্গস্বামীর মঠ। সকলের মনের ইচ্ছেপূরন করতে সেই ঘাটে নৌকা ভেরান হলো। গঙ্গা থেকে খাড়াই সিঁড়ি উঠেছে প্রায় চার তলার সমান। মঠে ঢুকে আনন্দে মন ভরে গেল। এক বিশাল শিবলিঙ্গ, এই শিব পাথরটি গঙ্গা থেকে তুলে এনে ছিলেন ত্রৈলঙ্গস্বামী স্বয়ং। অসীম শিবশক্তির বাঙ্ময় প্রকাশ ফুটে বেরোচ্ছে সেই লিঙ্গ থেকে। ওঁনার একটি পাথরের মূর্তিও রয়েছে, এছাড়া ত্রৈলঙ্গস্বামীর বড় পট, দুপাশে রামকৃষ্ণদেব ও মা সারদার পট রয়েছে। মন ভরে শিবের পূজো করে শান্ত মনে সব নৌকায় গিয়ে বসলাম, নামবো দশাশ্বমেধ ঘাট। ধীর পায়ে এবার আমরা মা অন্নপূর্ণার প্রসাদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে এগোলাম। খবর আগে থেকেই নেওয়া ছিল। সেখানে পৌঁছে ব্যবস্থাপনা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। শয়ে শয়ে তীর্থযাত্রীদের বিনামূল্যে পরম যত্নে ডেকে চেয়ার টেবিলে বসিয়ে পেট পুরে খাওয়ানো চলছে। মোটকথা যে গিয়ে লাইনে দাঁড়াবে সেই প্রসাদ পাবে, এটাই স্থান মাহাত্ম্য কেউ উপোসী থাকবে না। বেলা দুটোর মধ্যে প্রথম পর্ব মিটে গেল। এবার সাইট সিন আর কেনাকাটা মিটলেই বেনারস ঘোরার ইতি টানা।

আজ পনেরো-ই মার্চ, সকাল সাতটায় বেরিয়ে পড়লাম, দলমত সাপেক্ষে আমরা প্রথমে বিন্ধ্যাচলে মা বিন্ধ্যবাসিনী দর্শন করে, এলাহাবাদ রওনা দিলাম, ভরদুপুরে এলাহাবাদ এসে পৌঁছোলাম। এখানে সঙ্গমে স্নান করব আগে থেকেই স্থির করা ছিল। তাই তড়িঘড়ি করে নৌকার মাঝিদের সাথে দড়াদড়ি শুরু হলো। শেষে নৌকায় উঠে বসে মাঝি-ভাইয়ের নির্দেশ মত সবাই গায়ে লাইভ জ্যাকেট চাপালাম। শুরু হলো সঙ্গম যাত্রা। এখানেও পর্যটক সংখ্যা স্বল্পই। যাত্রা পথকে আনন্দময় করে তুললো ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা পাখীর দল। তারা নৌকার দুধারে উড়তে উড়তে চলল, সঙ্গম পর্যন্ত। একে একে স্নান সারা হলো, মনের আর এক আশ মিটল। ক্ষনিকের তরে ভাবনার গভীর তলদেশে ডুবল মন। গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতীর মিলনস্থল এই সঙ্গম। সরস্বতী নদী অন্তসলিলা। কত যুগের নিবিড় অন্বেষণে মানুষ প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রকে খুঁজে পেয়ে নাম রেখেছে প্রয়াগতীর্থ, সে এক গল্পকথা সঙ্গম কে কেন্দ্র করেই এখানে আয়োজন হয় কুম্ভমেলার। এখন শুধু ধুঁ ধুঁ বালির চড়া, যাই হোক নদী আপন খেলায় মিলিত হয়ে, আপন খেয়ালে যে যার পথে বয়ে চলেছে, আমাদের নৌকাও নদীপথ বেয়ে তীরে এসে ভিড়ল। পথে ক্ষুদা নিবৃতির পরে কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে, গাড়ি ছুটল বেনারসের উদ্দেশ্যে।

আজ মার্চ মাসের ষোলো তারিখ। বাবা বিশ্বনাথ কে অন্তরের প্রনাম জানিয়ে, সকালের লখনউগামী ট্রেনে উঠলাম সদলে। এই তিনটে দিন যেন এক ঘোরের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল। আধ্যাত্মিক আবহের মধ্যে করোনার অনুজীবের স্পর্শ, গন্ধ আমাদের ত্রিসীমানায় অনুভূত হয়নি। ভরা দুপুরে লখনউ পৌঁছে গেলাম। আমিনাবাদের কাছেই খুব ভালো হোটেল। মনের খুশিতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এল। সন্ধ্যে হতেই কেনাকাটা দিয়ে শুরু হলো আমাদের ঘোরার শেষ পর্বের সূচনা।

সতেরো তারিখে সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে সাইট সিন দেখতে বেরিয়ে পরা গেল। আমরা দলছুট তিনজন পৌঁছোলাম লখনউ রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানে নীবিড় নীরবতায় ঈশ্বরের সান্নিধ্যে বেশ কিছুটা সময় কাটল। বিচিত্র ফুলের সমারোহে সাজানো মিশনের বাগান। যেন এক শান্তিরআলয়। মনের শান্তি, প্রানের আরামে পরিপূর্ণ হয়ে  রওনা দিলাম ভোজনালয়ের দিকে। আমিনাবাদের “Tunday Kabab”এ এসে সবে জায়গা ঠিক করে বসেছি, আমদের বাকি সদস্যরা সহাস্যে এসে ঢুকল ঠিক সেই মূহুর্তে। একসাথে খাওয়ার আয়োজন শুরু হতে হতেই তাদের মুখে জানলাম ভুলভুলাইয়ার পর, বড় ইমামবাড়া দেখা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সিকিউরিটির লোকেরা তড়িঘড়ি সব মানুষজন কে বার করে দিতে উদ্যত হলেন। শোনা গেল আজ থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সব দর্শনীয় স্থানসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হলো। তাই ছোট ইমামবাড়া আর দেখা হলো না। অর্থাৎ অনুমান করা গেল, উপর মহল জানিয়েছেন COVID-19 এর অদৃশ্য অনু-সৈন্যদল উপস্থিত। দর্শনীয় স্থানের তালা পড়ার খবরে সকলের মুখেই চিন্তার ভাঁজ পরলো। এরপর হোটেলে ফিরে জানলাম, হোটেল মালিক এই সপ্তাহে নতুন বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাজার দোকান তখনও স্বাভাবিক। যাক আমার ভ্রমণ বৃত্তান্ত এখনকার মত শেষ। আগামীকাল আঠারো তারিখ। কলকাতা ফেরার ট্রেন বিকেলে। সুস্থ শরীরে, আনন্দ মনে, নির্বিঘ্নেই লখনউ ত্যাগ করে কলকাতাগামী ট্রেনে উঠলাম। ঊনিশের বিকেলে যথা সময়ে যে যার বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। এবার জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে অকপটে স্বীকার করি এক দৈবশক্তির গোপন নির্দেশে আমাদের এই তীর্থ ভ্রমণ শুরু থেকে শেষ হয়েছিল।

ভারতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাইশে মার্চ রবিবার দেশব্যাপী জনতা কারফিউ জারি হলো, করোনা সংক্রমণ রুখতে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ততদিনে লকডাউন শব্দটির অর্থ বুঝে গেছে। আমাদের দেশে লকডাউন ঘোষণা হলো চব্বিশে মার্চ রাত্রি বারোটায়। পরদিন ভোর থেকে জনজীবন হলো স্তব্ধ। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত চলছে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই । প্রকৃতি এখন আপন আনন্দে মত্ত। মানব প্রানী এখন ঘরবন্দী জীব। এই বলে শেষ করি কোন এক নিয়ামকের বার্তায় লকডাউনের তীরটা আমাদের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

18+

Leave a Comment

error: Content is protected !!